1. mahadihasaninc@gmail.com : admin :
  2. hossenmuktar26@gmail.com : Muktar hammed : Muktar hammed
ইসলামী ক্যালেন্ডার প্রবর্তন ও আশুরার তাৎপর্য - dailybanglakhabor24.com
  • June 7, 2024, 7:14 am

ইসলামী ক্যালেন্ডার প্রবর্তন ও আশুরার তাৎপর্য

  • Update Time : মঙ্গলবার, জুলাই ২৫, ২০২৩ | দুপুর ১:১৪
  • 59 Time View

এনামুল হক কাফী

হিজরি সন ইসলামের ইতিহাসে একটি মৌলিক ও গৌরবোজ্জ্বল দিক এবং মুসলমানদের কাছে অশেষ ঐতিহ্যের অবদানে মহিমান্বিত ও মর্যাদাপূর্ণ হওয়ায় পৃথিবীর সর্বত্র সমানভাবে সমাদৃত।
আরবি বর্ষপঞ্জির সঙ্গে পৃথিবীর ১৬০ কোটি মুসলমানের ধর্মীয় আবেগ-অনুভূতি ও ইসলামি আচার-অনুষ্ঠান সর্বোপরি ইবাদত-বন্দেগির বিষয়টি সরাসরি সম্পৃক্ত।
ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা ফারুকে আজম হযরত ওমর (রা) এর শাসনামলে ইসলামী ক্যালেন্ডার প্রবর্তনের ব্যাপারে এক পরামর্শ সভায় দীর্ঘ আলোচনার পর সর্বসম্মতিক্রমে হিজরতকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে স্থির হয় যে হিজরত সত্য ও মিথ্যার পার্থক্য নির্ণয় করেছে,ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সুযোগ করে দিয়েছে। হিজরত থেকে ইসলামি ক্যালেন্ডারের গণনা শুরু হবে।
অতঃপর প্রথম মাস মুহাররাম ও শেষ মাস জিলহজ্জ হবে ওমর ওসমান আলী রা. তিন জনই একমত হলেন এবং সমস্ত সাহারা একমত হলেন এব্যাপারে। এভাবে ইসলামি ক্যালেন্ডার এর শুভ সূচনা হয়।
কারো মতে নবী করিম (সা.) ৬২২ খ্রিষ্টাব্দের রবিউল আউয়াল মাসে মদিনায় হিজরত করেন, কিন্তু এর প্রস্তুতি ও আকাবার শেষ বায়আতের পরবর্তী সময়ে হিজরতের সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরে প্রথম যে চাঁদটি উদিত হয়েছিল, তা ছিল মহররম মাস। অন্যান্য সাহাবায়ে কিরামের হিজরত মহররম থেকে শুরু হয়েছিল, তাই হিজরি সনের প্রথম চান্দ্রমাস মহররম থেকে ধরা হয়।
হিজরি সনের সঙ্গে মুসলমানদের বিশেষ ঐতিহ্য নিহিত রয়েছে। যদিও হিজরতের সময়কাল থেকে হিজরি সন বা চান্দ্রবর্ষ গণনা আরম্ভ হয়, কিন্তু এ পৃথিবীর জন্মলগ্ন থেকে চান্দ্রমাসের গণনা শুরু হয়েছে। আসমান ও জমিন সম্পর্কে পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে,
‘নিশ্চয়ই মহাকাশ ও পৃথিবী সৃষ্টির দিন থেকে আল্লাহর বিধানে আল্লাহর কাছে গণনায় মাস ১২টি, তন্মধ্যে চারটি মাস সম্মানিত, এটিই সুপ্রতিষ্ঠিত বিধান; সুতরাং এর মধ্যে তোমরা নিজেদের প্রতি অত্যাচার কোরো না।’ (সূরা আত-তাওবা, আয়াত: ৩৬)
আরবি চান্দ্রবর্ষ তথা হিজরি সনের প্রথম মাস হলো মহররম। ‘মহররম’ শব্দের অর্থ অলঙ্ঘনীয় পবিত্র। ইসলামে মহররম মাসটি অত্যন্ত মর্যাদাবান ও ফজিলতময়। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা যে চারটি মাস সম্মানিত বলে ঘোষণা করেছেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁর মুখ নিঃসৃত অমিয় বাণীর মাধ্যমে তা সুস্পষ্ট ও নির্দিষ্ট করে দিয়েছেন। বিদায় হজের ভাষণে সম্মানিত মাসগুলোকে চিহ্নিত করে তিনি বলেছেন, ‘তিনটি মাস হলো ধারাবাহিক জিলকদ, জিলহজ ও মহররম, অপরটি হলো রজব।’ (বুখারি)
সৃষ্টির আদিকাল থেকেই চান্দ্রমাসের হিসাব মহান আল্লাহর গণনায় রয়েছে। যুগ যুগ ধরে মানুষ চান্দ্রমাসের হিসাব করে চলেছে। প্রাচীনকাল থেকে পূর্ববর্তী সব নবী-রাসুলের শরিয়তে ১২ চান্দ্রমাসকে এক বছর গণনা করা হতো এবং তন্মধ্যে জিলকদ, জিলহজ, মহররম ও রজব—এ পবিত্র চারটি মাসকে বরকতময় ও সম্মানিত মনে করা হতো।
এ মাসগুলোকে ‘আশ-শাহরুল হারাম’ বা অলঙ্ঘনীয় পবিত্র মাস বলা হতো। এ চারটি মাসে যেকোনো ইবাদতের সওয়াব বৃদ্ধি পায়। তেমনি এ সময়ে পাপাচার করলে এর ভয়াবহ পরিণাম ও কঠোর শাস্তি ভোগ করতে হয়। পূর্ববর্তী শরিয়তসমূহে এ মাসগুলোতে সব ধরনের যুদ্ধবিগ্রহ, ঝগড়া-ফ্যাসাদ, মারামারি, খুনোখুনি প্রভৃতি নিষিদ্ধ ছিল।
মহররম মাসের দশম তারিখ আশুরা নামে পরিচিত।
সেমেটীয় ভাষায় আশুরা শব্দের মূল অর্থ দশম ; তাই স্মরণীয় দিবসের নামটি আক্ষরিকভাবে অনুবাদ করা হয়েছে, যার অর্থ “দশম দিন”। প্রাচ্যবিদ এ. জে. ওয়েনসিঙ্কের মতে, নামটি এসেছে আরামীয় নির্ধারক সমাপ্তি সহ হিব্রু ʿভাষা থেকে। দিনটি প্রকৃতপক্ষে মাসের দশম দিন, যদিও কিছু ইসলামি পণ্ডিত ভিন্ন ভিন্ন ব্যুৎপত্তি প্রদান করেন।
আসমান-জমিন সৃষ্টিসহ পৃথিবীতে অনেক স্মরণীয় ও যুগান্তকারী ঘটনা এ মাসের ১০ তারিখে অর্থাৎ পবিত্র আশুরার দিন সংঘটিত হয়েছিল। মহররম সংশ্লিষ্ট ২০টি ঘটনার সংক্ষিপ্ত শিরোনাম নিম্নে তুলে ধরা হলো-
১. আকাশ জমিন পাহাড়-পর্বত সব কিছু সৃষ্টি।
২. আদম (আ.)-এর সৃষ্টি ।
৩. নূহ (আ.) মহাপ্লাবন শেষে জুদি পাহাড়ে অবতরণ। ৪. হজরত ইবরাহিম (আ.) নমরুদের প্রজ্বলিত অগ্নিকুণ্ড থেকে মুক্তিলাভ।
৫. দীর্ঘ ১৮ বছর রোগ ভোগের পর হজরত আইয়ুব (আ.)-এর দুরারোগ্য ব্যাধি থেকে মুক্তিলাভ।
৬. হজরত সুলাইমান (আ.)কে পৃথিবীর রাজত্ব দান।
৭. হজরত ইউনুস (আ.)কে ৪০ দিন পর দজলা নদীতে মাছের পেট থেকে উদ্ধার।
৮. হজরত মূসা (আ.) ফেরাউনের কবল থেকে রক্ষা।
৯. হজরত ঈসা (আ.)-এর পৃথিবীতে আগমন এবং জীবতাবস্থায় আসমানে উত্তোলন।
১০. হজরত ইদ্রিস (আ.)কে আসমানে উত্তোলন।
১১. হজরত দাউদ (আ.)কে বিশেষ সম্মানে ভূষিত।
১২. খায়বার যুদ্ধের বিজয় অর্জন।
১৩. মাদায়েন এবং কাদিসিয়ার যুদ্ধে বিজয় অর্জন। ১৪. হজরত আদম (আ.)-এর জান্নাতে প্রবেশ।
১৫. হজরত আদম (আ.)কে জান্নাত থেকে দুনিয়ায় প্রেরণ এবং গুনাহ মার্জনার পর তার সঙ্গে হাওয়া (আ.)-এর পুনঃসাক্ষাৎ লাভ।
১৬. হজরত নূহ (আ.)কে তুফান ও প্লাবন থেকে পরিত্রাণ প্রদান।
১৭. হজরত সোলায়মান (আ.)কে হারানো বাদশাহি ফিরিয়ে দেওয়া।
১৮. হজরত ইয়াকুব (আ.) কর্তৃক হারানো পুত্র হজরত ইউসুফ (আ.)-এর সঙ্গে সাক্ষাৎ লাভ।
১৯. প্রিয়নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) মক্কা শরিফ থেকে হিজরত করে মদিনা শরিফে আগমন।
২০. হজরত ইমাম হোসাইন (রা.) এবং তার ৭৭ ঘনিষ্ঠজন স্বৈরশাসক ইয়াজিদের সৈন্য কর্তৃক
১০ মহররম ফোরাত নদীর তীরে কারবালা প্রান্তরে আল্লাহর জমিনে আল্লাহর দ্বীনকে বিজয়ী করার লক্ষ্যে অন্যায়-অসত্যের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করতে গিয়ে শাহাদতের অমিয় সুধা পান করেন বিশ্বনবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) এর দৌহিত্র হজরত হোসাইন (রা.)।
ইসলামের ইতিহাসে সবচাইতে মর্মান্তিক ও দুঃখজনক কারবালার বিষাদময় ঘটনা। ইসলামি দুনিয়াকে শিয়া ও সুন্নী নামে দুটি পৃথক শিবিরে বিভক্ত করে দিয়েছে।
নিষ্ঠুর, বিশ্বাসঘাতক, অযোগ্য রাজা ইয়াজিদের বিরুদ্ধে সত্য ন্যায় ও ইসলামি খেলাফত প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে বীর বিক্রমে জেহাদ করে শাহাদাৎ বরণ করেন ইমাম হোসাইন( রা.)।
কারবালার প্রান্তরে হোসাইনের মস্তক ছিন্ন করা হয়,মৃতদেহ পদদলিত করা হয়। মস্তক কুফার দূর্গে নিয়ে যাওয়া হলে নৃশংস উবায়দুল্লাহ মুখমন্ডলে বেত্রাঘাত করে। তাই আশুরায় মর্সিয়া নয় সত্যও ন্যায়ের পথে অবিচল থেকে বাতিলের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে আদর্শকে সমুন্নত রাখা আমাদের দায়িত্ব ও কর্তব্য।
আশুরার আমল: আশুরার কারণে মহররম মাসের গুরুত্ব এবং তাৎপর্য অপরিসীম। আল্লাহ তায়ালার প্রিয় মাস মহররম।
ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) যখন মক্কা থেকে হিজরত করে মদীনায় আগমন করলেন, দেখলেন মদীনার ইয়াহুদীরা আশুরার দিবসে রোজা পালন করছে।
তাদেরকে রোজা রাাখার কারণ জিজ্ঞেস করা হলে তারা বললো, এই দিনটি আমাদের কাছে খুব গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এই দিনে আল্লাহ তায়ালা মুসা (আ.) এবং তার সম্প্রদায় বনী ইসরাঈলকে ফেরআউনের কবল থেকে মুক্ত করেছেন এবং তার উপর বিজয় দান করেছেন।
আর তারই শুকরিয়া হিসেবে এদিনে মুসা (আ.) রোজা রেখেছিলেন। তাই আমরাও এই দিনে রোজা রাখি।
তখন রাসুল (সা.) বললেন মুসা (আ.) এর সাথে সম্পর্কের ক্ষেত্রে তোমাদের চেয়ে আমিই বেশি হকদার। তারপর তিনি নিজেও রোজা রাখলেন সাহাবাকেও রোজা রাখার নির্দেশ দিলেন। (মুসলিম : ২৬৫৩)
তবে ইয়াহুদীরা আশুরা উপলক্ষে একদিন রোজা রাখে। তাদের রোজার সাথে যেন মুসলমানদের রোজার সাদৃশ্য না হয়, তাই মুসলমানরা আশুরার রোজার সাথে ৯ অথবা ১১ তারিখে আরো একটি রোজা বৃদ্ধি করে মোট দুইটি রোজা রাখবে।
হজরত আবু হোরায়রা (রা.) বলেন, রমজানের রোজার পর সবচেয়ে ফজিলতপূণর্ রোজা হলো মহররমের রোজা। (তিরমিজি : ২৪৩৮)।
মহান আল্লাহতায়ালা মুসলিম উম্মাহকে সঠিক পথে চলার তাওফিক দান করুন। আমিন।

লেখক
মাওলানা এনামুল হক কাফী
কবি ও সাহিত্যিক

Please Share This Post in Your Social Media

More News Of This Category